কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল দশা সৃষ্টি হয়েছে। বাবা-মায়ের কোল ছেড়ে কোমলমতি শিশুরা যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের স্নেহস্পর্শে নিজেদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার কথা, তখন সেই সব শ্রেণিকক্ষে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সময় কাটছে আতঙ্ক, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা নিয়ে। এই বুঝি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের ছাদ থেকে মাথার ওপর খসে পড়ছে পলেস্তারা! শুধু তাই নয়, ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে বেরিয়ে রয়েছে জরাজীর্ণ মরচেপড়া রড, যা শিক্ষার্থীদের আতঙ্কের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এছাড়াও রয়েছে শ্রেণিকক্ষের তীব্র সংকট। কোনো কোনো শ্রেণিকক্ষের মাঝখানে টাঙানো বা ঝুলানো হয়েছে কাপড়ের পর্দা। সেই পর্দার দুই পাশে একসঙ্গে চলছে দুই শ্রেণির পাঠদান। একদিকে শিক্ষকের পাঠদান, অন্যদিকে পাশের শ্রেণির কোলাহল—এভাবেই ব্যাহত হচ্ছে শিশু শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ। এমন চিত্র দৌলতপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার অর্ধশতাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের।
এমন করুণ শিক্ষা ব্যবস্থায় উদ্বেগ বাড়ছে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মনেও। যে বয়সে বই-খাতা নিয়ে নির্ভয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা শিশুদের, সে বয়সেই তাদের সময় কাটছে দুর্ঘটনার আশঙ্কায়। অভিভাবকদের মনে একটাই প্রশ্ন—সন্তানকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে তারা কি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাচ্ছেন?
দৌলতপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, দৌলতপুর উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ২১৭টি। এর মধ্যে ১৯৯০ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে নির্মিত ৩ কক্ষবিশিষ্ট অনেক বিদ্যালয় ভবন জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। কোথাও ভবন ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ায় বিকল্প স্থানে চলছে পাঠদান, আবার কোথাও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। শিক্ষা অফিসের হিসাবে, উপজেলায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি বিদ্যালয়ে নতুন ভবন নির্মাণ হয়নি এবং পুরোনো ভবনগুলোও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা গেছে, উপজেলার ৯১ নম্বর চর আমলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩ কক্ষবিশিষ্ট মূল ভবনের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় শিক্ষকরা বাধ্য হয়ে আগের একটি পরিত্যক্ত টিনশেড ঘরে পাঠদান কার্যক্রম চালাচ্ছেন।
পাশেই ৯২ নম্বর পিপুলবাড়ীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্রও উদ্বেগজনক। সেখানে জরাজীর্ণ ভবনেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলছে পাঠদান। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় সিঁড়ির কক্ষকে অফিস হিসেবে ব্যবহার করতে হচ্ছে। ছাদ ও দেয়ালের ভাঙাচোরা অবস্থা দেখে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ওই বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. আনাস বলে, ‘আমাদের স্কুল ভবনে অনেক সমস্যা। মাঝেমধ্যেই ছাদের পলেস্তারা বা অংশ ভেঙে পড়ে। এ কারণে ক্লাসে স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা সবসময় আতঙ্কে থাকি। বিদ্যালয়ের ভবনটি নতুন করে তৈরি করে দিলে নিরাপদে ও সুন্দর পরিবেশে লেখাপড়া করতে পারব।’
একই শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহিয়া খাতুন জানায়, জরাজীর্ণ ভবনের কারণে তারা শ্রেণিকক্ষে স্বাভাবিকভাবে বসতে পারে না। যেকোনো সময় ছাদের সিমেন্ট বা রড খুলে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সম্প্রতি ছাদের একটি অংশ ভেঙে পড়ে তার এক বান্ধবী আঘাত পেয়েছে বলেও জানায় সে। তার ভাষ্য, ‘আমাদের স্কুলে নতুন ভবন করে দিলে আমরা নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে পড়াশোনা করতে পারব।’
একই বিদ্যালয়ের অভিভাবক মোছা. হিরা খাতুন বলেন, ‘আমার দুই সন্তান পিপুলবাড়ীয়া সরকারি প্রাথমিক স্কুলে পড়ে। কিন্তু শ্রেণিকক্ষের অবস্থা খুবই নাজুক। ছাদ ও দেয়াল যেভাবে ভেঙে পড়ছে, তাতে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠিয়ে সবসময় আতঙ্কে থাকি। কখন যে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যায়, সেই ভয় কাজ করে। কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ, দ্রুত শ্রেণিকক্ষ মেরামত কিংবা নতুন ভবনের ব্যবস্থা করা হোক।’
শুধু জরাজীর্ণ ভবনই নয়, সংকট রয়েছে শ্রেণিকক্ষের। উপজেলার ১৬৫ নম্বর তালবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি কক্ষের মাঝখানে কাপড়ের পর্দা ঝুলিয়ে দু’ভাগ করা হয়েছে। পর্দার দুই পাশে পৃথক দুটি শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম চালাতে দেখা গেছে দুই শিক্ষককে। এমনকি ব্ল্যাকবোর্ডও ভাগ করে ব্যবহার করতে দেখা গেছে শিক্ষকদের। ফলে এক শ্রেণির শিক্ষকের কথা অন্য শ্রেণিতে পৌঁছে যাচ্ছে, এতে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে তারা জানায়।
ওই বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদিয়া ও জুনায়েদ জানায়, একই কক্ষে দুটি ক্লাস চলায় শিক্ষকদের কথা ঠিকমতো শোনা যায় না। পাশের শ্রেণির শব্দে পড়া বুঝতে অনেক কষ্ট হয় তাদের।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুমি খাতুন বলেন, ‘কক্ষ সংকটের কারণে বাধ্য হয়েই পর্দা টাঙিয়ে ক্লাস নিতে হচ্ছে। একই সময়ে দুই শিক্ষক পাঠদান করায় শব্দ মিশে যায়। এতে শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশ নষ্ট হয়।’
তালবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হেলাল উদ্দিন জানান, বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ১০৮ জন। স্বাভাবিকভাবে একটি শ্রেণিকক্ষে প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী বসতে পারে। কিন্তু কক্ষের অভাবে কখনো দুটি শ্রেণির ৪০ থেকে ৪২ জন শিক্ষার্থীকে এক কক্ষে বসিয়ে পাঠদান করাতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় পড়ালেখা স্বাভাবিক ও সচল রাখতে অনিচ্ছা সত্ত্বে একটি কক্ষকে পর্দা দিয়ে দুই ভাগ করে পাঠদান চালাতে হচ্ছে। দ্রুত নতুন ভবন বরাদ্দ না পেলে শিক্ষার মান ধরে রাখা কঠিন হবে।’
শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকা প্রসঙ্গে দৌলতপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তাক আহম্মেদ জরাজীর্ণ ভবন ও শ্রেণিকক্ষ সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘উপজেলায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি বিদ্যালয়ে নতুন ভবন হয়নি এবং পুরোনো ভবনগুলো জরাজীর্ণ।
ইতোমধ্যে অনেক বিদ্যালয় পরিত্যক্ত ঘোষণা করে বিকল্প ব্যবস্থায় পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। নব্বইয়ের দশকে নির্মিত ভবনগুলো চিহ্নিত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তালিকা পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিডিপি-৪)-এর আওতায় অনেক উন্নয়ন কাজ হয়েছে। সামনে পিডিপি-৫-এর কার্যক্রম শুরু হলে আশা করা হচ্ছে, আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে এসব ভবনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হবে এবং জরাজীর্ণ ভবনের সমস্যার সমাধান হবে।’
এমন আশ্বাসের অপেক্ষায় থাকা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে শঙ্কার বিষয় শিক্ষার অনিরাপদ পরিবেশ। শিশুদের জন্য বিদ্যালয় হবে নিরাপদ আশ্রয়, জ্ঞান অর্জনের আনন্দময় স্থান ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ—যেখানে থাকবে না ভয় আর নিরাপত্তা ঝুঁকির আতঙ্ক। শিশুর স্বপ্ন যেন ভেঙে পড়া ছাদের নিচে চাপা না পড়ে, শ্রেণিকক্ষের কোলাহলে যেন হারিয়ে না যায় তার শেখার আগ্রহ।
তাই জরাজীর্ণ ভবনগুলোর নিরাপত্তা যাচাই, প্রয়োজনীয় সংস্কার বা নতুন ভবন নির্মাণ এবং পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহল। তাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপে দৌলতপুরের জরাজীর্ণ বিদ্যালয়গুলো আবারও হয়ে উঠবে নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন; যেখানে শিশুরা আতঙ্ক নয়, নিশ্চিন্তে বই হাতে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পারবে।