লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে বর্তমান মজুরি দিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকা পোশাক শ্রমিকদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাজারদরের সাথে সংগতি রেখে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য একটি মানবিক ও জীবনধারণ উপযোগী মজুরি নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি এম এ শাহীন।
পোশাক খাতের শ্রমিকদের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে 'শ্রমিক আওয়াজ'-এ দেয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এসব কথা বলেন।
এম এ শাহীন বলেন, "আমাদের দেশের শ্রম আইনের (সংশোধনী ২০২৫) বিধান অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর পরপর গার্মেন্টস সেক্টরের শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই প্রেক্ষিতে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন করে শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের জোর দাবি জানাচ্ছি।"
তিনি আরও বলেন, "বাসা ভাড়া, পরিবহন খরচ এবং চিকিৎসা ব্যয়সহ সবদিক থেকে শ্রমিকদের খরচ বাড়লেও মজুরি বাড়ছে না। এর ওপর গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে অনেক শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বেশ কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং অনেক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে ভিন্ন পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।"
বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো চালুর বিষয়ে তিনি বলেন, "এই শ্রমিকদের টিকিয়ে রাখা এবং বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে সরকার ও উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। যৌথ উদ্যোগে বন্ধ কারখানা চালু করে কর্মহীন শ্রমিকদের আবার কর্মসংস্থানে ফেরানোর দাবি আমরা সরকারের কাছে তুলছি।"
সরকারের নীতির সমালোচনা করে তিনি উল্লেখ করেন, "বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেকারত্ব দূর করার কথা বলেছিল। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না; বরং রাষ্ট্রীয় কারখানাগুলো ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তর করা হচ্ছে। আমরা মনে করি, দেশের অর্থনীতির স্বার্থে বন্ধ কারখানাগুলো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে আধুনিকায়ন করে পুনরায় চালু করা এবং যৌক্তিক মজুরি নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি।"
শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়ে শাহীন বলেন, "সরকার অন্যান্য ক্ষেত্রে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বা কার্ড চালু করলেও শ্রমিকদের ক্ষেত্রে তা করেনি। শ্রমিকরা কেবল উৎপাদনের মূল শক্তিই নন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও প্রধান অংশীদার। তাই আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের জন্য সার্বজনীন রেশনিং ব্যবস্থা, বাসস্থান ও বিনামূল্যে চিকিৎসার দাবি জানাচ্ছি। কিন্তু সরকার তা বিবেচনায় না নিয়ে কেবল সরকারি কর্মচারীদের রেশনিং ব্যবস্থার উদ্যোগ নিচ্ছে।"
তিনি মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, "শ্রমিকদের ন্যায্য ও সংগত দাবি না মানায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছে। সরকার এসব দাবি বিবেচনায় না নিলে শ্রমিকরা রাজপথে নামতে বাধ্য হবে। আমরা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমেই দাবি আদায় করতে চাই; তবে অবহেলা অব্যাহত থাকলে শিল্পে অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে, যা দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।"
সরকারি পে-কমিশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "সরকারি কর্মচারীদের পে-কমিশন বাস্তবায়িত হলে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম আরেক দফা বাড়বে। পোশাক, টেক্সটাইল, ডাইং, নিটিং ও প্রিন্টিং খাতের শ্রমিকদেরও একই বাজার থেকেই কেনাকাটা করতে হয়। ফলে দ্রব্যমূল্যের বাড়তি চাপ তাদের আরও বেশি সংকটে ফেলবে।"
এজন্য শ্রম আইন অনুযায়ী অবিলম্বে মজুরি বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করে আগামী ডিসেম্বরে যথাসময়ে গার্মেন্টস শ্রমিকদের নতুন মজুরি পুনর্নির্ধারণ করার আহ্বান জানান তিনি।
এ জাতীয় আরো খবর..