দেশের বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী বাজারে পোশাক শ্রমিকদের বর্তমান মজুরি ও ইনক্রিমেন্টে জীবন চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে অবিলম্বে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন অথবা জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে ১ হাজার টাকা মূল্যে চারজনের পরিবারের জন্য চাল, ডাল, আটা ও তেলসহ প্যাকেজ রেশন চালুর দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ পোশাক শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মো. তৌহিদুর রহমান।
শ্রমিকদের জীবন নির্বাহের ব্যয় বৃদ্ধি সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে শ্রমিক আওয়াজের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি এ কথা বলেন।
মো. তৌহিদুর রহমান বলেন, ‘২০২৩ সালে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছিল, যা পাঁচ বছরে প্রায় ৬৩ শতাংশ বৃদ্ধি। সেই হিসেবে প্রতি বছর গড়ে ১২ শতাংশের বেশি মজুরি বেড়েছে। আর বর্তমানে বার্ষিক ৯ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এই ৯ শতাংশ বা ১৫-২০ শতাংশ বৃদ্ধি হলেও শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।’
তিনি বলেন, সংশোধিত শ্রম আইন অনুযায়ী এখন প্রতি তিন বছর পর পর মজুরি রিভিউ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ২০২৩ সালের সর্বশেষ মজুরি কাঠামোর পর আগামী ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে নতুন মজুরি রিভিউ হওয়ার কথা। তবে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ-এর সভাপতি ইতিমধ্যে জানিয়েছেন যে তিন বছর পর এই রিভিউ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়, তারা পাঁচ বছর পরেই এটি মানবেন। মালিকপক্ষের এমন অবস্থানকে শ্রমিকদের জন্য একটি বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
এই অচলাবস্থা নিরসনে নির্বাচিত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শ্রমিক নেতা তৌহিদুর রহমান বলেন, ‘সরকার মালিকপক্ষ ও শ্রমিক পক্ষকে নিয়ে অবিলম্বে সংলাপে বসুক এবং সিদ্ধান্ত নিক যে এই বছরই আইন অনুযায়ী রিভিউ বাস্তবায়ন করা হবে কি না। আমাদের প্রধান ও এক নম্বর দাবি হলো নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করা।’
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘যদি কোনো টেকনিক্যাল কারণে এই মুহূর্তে মজুরি বোর্ড গঠন করা না হয়, তবে শ্রমিকদের বাঁচাতে হয় মালিকদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার আরও বাড়াতে হবে, না হয় সরকারকে ভরতুকি (সাবসিডি) দিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় শ্রমিকরা আর বাঁচবে না।’
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল ও বাজার পরিস্থিতির ওপর এর প্রভাব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘সরকারি চাকরিজীবীদের পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার ফলে বাজারে নতুন করে প্রভাব পড়বে। আমরা যে বাজারে যাবো, সরকারি কর্মকর্তারাও সেই বাজারে যাবেন। তাদের বেতন বৃদ্ধির কারণে ১০ টাকার জিনিস ২০ টাকা হয়ে যাবে, যা সাধারণ পোশাক শ্রমিকদের ছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে।’
এই বৈষম্যমূলক পরিস্থিতির সমাধানে তিনি ১ হাজার টাকার প্যাকেজ রেশনের দাবি তুলে ধরে বলেন, ‘সরকার শুধু দাম বেঁধে দিলে হবে না, কারণ সেই দামে আমরা কিনতে পারি না। সরকারকে নির্দিষ্ট একটি মূল্য (১ হাজার টাকা) নির্ধারণ করে তার বিপরীতে চার সদস্যের একটি পরিবারের জন্য চাল, ডাল, আটা, তেল কিংবা শিশুখাদ্যসহ প্যাকেজ রেশন নিশ্চিত করতে হবে।’
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি দেশের বর্তমান বাজার ও শ্রমিকদের ঋণের বোঝার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘বর্তমান ইনক্রিমেন্ট ও মজুরিতে কোনোভাবেই শ্রমিকদের সংসার চলছে না। শ্রমিক পরিবারগুলোতে নাভিশ্বাস উঠেছে। তারা ক্রমান্বয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে এবং ঋণের দায়ে বাধ্য হয়ে অনেক শ্রমিক পরিবার ঢাকা ও গাজীপুর ছেড়ে চলে যাচ্ছে।’