দেশে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবনযাত্রাকে মারাত্মক চাপে ফেলেছে। চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দামের পাশাপাশি লাগামহীন জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ নাগরিকরা। এ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতির প্রভাব থেকে সাধারণ মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিতে সময়োপযোগী ও কার্যকর কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সার্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সামষ্টিক অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি আবাসন ও শ্রমিকদের নিত্যপণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতি-সহায়তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক আয়ের সবচেয়ে বড় অংশই ব্যয় হয় আবাসন খাতে। রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব বিভাগীয় ও শিল্পাঞ্চলে আয়ের অর্ধেকেরও বেশি বা ক্ষেত্রবিশেষে দুই-তৃতীয়াংশ অর্থ চলে যায় বাসাভাড়ায়। এ ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত সরকারি নীতিমালা গ্রহণ করা গেলে কোটি মানুষের ওপর থেকে আর্থিক চাপ অনেকাংশে কমে আসবে।
প্রথমত, প্রতিটি অঞ্চলের জীবনযাত্রার মান ও সুযোগ-সুবিধার ওপর ভিত্তি করে এলাকাভিত্তিক একটি যৌক্তিক বাসাভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া প্রয়োজন। এর সঙ্গে বাড়িভাড়া লেনদেন সম্পূর্ণরূপে ব্যাংক বা ডিজিটাল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা জারি করতে হবে। এতে একদিকে যেমন নগদ টাকার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কমবে, অন্যদিকে বাসাভাড়ার সঠিক তথ্য ব্যাংক ও আয়কর কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে আসবে।
তবে কেবল কঠোর নিয়ম চাপিয়ে না দিয়ে বাড়িওয়ালাদেরও যৌক্তিক সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে পারে সরকার। অনেক বাড়িওয়ালাই ব্যাংকঋণ নিয়ে বাড়ি তৈরি করেন এবং প্রতি মাসে বড় অঙ্কের কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে নির্দেশিকা জারি করে বলা যেতে পারে—যেসব বাড়ির মালিক নিবন্ধিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বাসাভাড়া সংগ্রহ করবেন, তাঁদের বিদ্যমান ঋণের সুদের হার কিছুটা কমিয়ে দেওয়া হবে এবং মাসিক কিস্তির পরিমাণ পুনর্নির্ধারণ বা সহজ করা হবে। এই পদক্ষেপ বাড়িওয়ালাদের ব্যাংক বা ডিজিটাল মাধ্যমে ভাড়া নিতে উৎসাহিত করবে এবং একই সঙ্গে উভয় পক্ষই একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর সুবিধা পাবে।
অন্যদিকে, দেশের রপ্তানি ও শিল্প খাতের প্রাণপ্রবাহ হিসেবে পরিচিত পোশাক ও অন্যান্য শিল্পকারখানার শ্রমিকদের ক্ষেত্রে সরকারের আরেকটি সমন্বিত উদ্যোগ যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। সম্প্রতি জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধি না পাওয়ায় শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষ ও মজুরি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন লক্ষ্য করা গেছে। কেবল নগদ বেতন বৃদ্ধি উল্টো মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই শ্রমিকদের জন্য কারখানাভিত্তিক সুলভ মূল্যের রেশনব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি।
শিল্পকারখানার মালিকদের বাধ্য করা বা উৎসাহিত করা যেতে পারে, যাতে তাঁরা তাঁদের নিবন্ধিত শ্রমিকদের জন্য প্রতি মাসে চাল, ডাল, তেল, আটার মতো অতিপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী সুলভ বা সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা করেন। সরকার টিসিবির (ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ) মাধ্যমে সরাসরি এসব কারখানায় পাইকারি মূল্যে বা ভর্তুকি দিয়ে নিত্যপণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে। এতে শ্রমিকদের বেতনের একটি বড় অংশ খাদ্যসামগ্রী কেনায় ব্যয় করা থেকে সাশ্রয় হবে এবং তাঁদের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে শিল্প খাতের চলমান অসন্তোষ কমবে এবং কারখানাগুলোতে উৎপাদনশীলতা ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে।
পরিশেষে বলা যায়, মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় ঐতিহ্যগত রাজস্ব ও মুদ্রানীতির পাশাপাশি দেশের বিশাল কর্মজীবী মানুষ ও সাধারণ ভাড়াটিয়াদের স্বস্তি দিতে এ ধরনের সুনির্দিষ্ট আইন ও প্রণোদনামূলক নীতির সমন্বয় ঘটানো দরকার। আবাসন খাতে সুশাসন এবং শিল্পশ্রমিকদের খাদ্যনিরাপত্তার ব্যবস্থা করা গেলে মূল্যস্ফীতির ধাক্কা কাটিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব।