• আপডেট টাইম : 14/10/2026 11:34 PM
  • 42 বার পঠিত
  • আওয়াজ প্রতিবেদক , সাভার
  • sramikawaz.com
 
গার্মেন্টস শ্রমিক-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে অবিলম্বে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন এবং ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে বর্ধিত মজুরি কার্যকরের দাবি জানিয়েছে এশিয়া ফ্লোর ওয়েজ অ্যালায়েন্স (এএফডব্লিউএ) বাংলাদেশ কমিটি। একই সঙ্গে শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ, ব্ল্যাকলিস্টিং ও হয়রানি বন্ধ, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও পরিচালনার স্বাধীনতা নিশ্চিত এবং শ্রমিকদের অধিকার লঙ্ঘনের দায়ে দেশীয় কারখানা মালিকদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও বায়ারদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা।
 
১৪ অক্টোবর, বুধবার বিকেল ৪টায় সাভারের হেমায়েতপুর শিল্পাঞ্চলের পদ্মার মোড়ে এএফডব্লিউএ বাংলাদেশ কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল থেকে এসব দাবি জানানো হয়।
 
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সম্মিলিত শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এবং এএফডব্লিউএ বাংলাদেশ কমিটির নেতা নাহিদুল হাসান নয়ন। সমাবেশ পরিচালনা করেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইন ও দরকষাকষি বিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু।
 
সমাবেশে বক্তব্য দেন গ্রিন বাংলা গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি ও এএফডব্লিউএ বাংলাদেশ কমিটির সদস্যসচিব সুলতানা বেগম এবং সহ-সভাপতি সেলিনা হোসাইন; বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ও এএফডব্লিউএ বাংলাদেশ কমিটির নেতা রফিকুল ইসলাম সুজন এবং সাধারণ সম্পাদক সুমাইয়া ইসলাম; সম্মিলিত শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি আঁখি, সহ-সভাপতি মোহাম্মদ ইয়াহিয়া ও সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ মনির; বাংলাদেশ গার্মেন্টস লেবার কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক ও এএফডব্লিউএ বাংলাদেশ কমিটির নেতা আল আমিন; টেক্সটাইল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের নেতা রোজিনা আক্তার এবং এএফডব্লিউএ বাংলাদেশ নারী কমিটির সভাপতি রাশিদা আক্তার ও সদস্যসচিব পারভিন আক্তার।
 
সমাবেশে শ্রমিক নেতারা বলেন, লাগামহীন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াত ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান মজুরি দিয়ে গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিজেদের ও পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রতিদিনের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। ফলে লাখ লাখ শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা চরম আর্থিক সংকট ও মানবেতর জীবনযাপনের শিকার হচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে আর কালক্ষেপণ না করে সরকার ও মালিকপক্ষকে অবিলম্বে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন এবং শ্রমিকদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে।
 
বক্তারা জানান, গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের দাবিতে এএফডব্লিউএ বাংলাদেশ জাতীয় কমিটির উদ্যোগে গত ১১ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে জাতীয় প্রেস ক্লাবে শ্রমিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে মিছিলসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও শ্রম মন্ত্রণালয়ে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের দাবিতে লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়। একই দাবিতে বিভিন্ন শ্রমিক ফেডারেশন ও জোটের পক্ষ থেকেও সরকারের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখনো এসব দাবির বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সরকারের এই নিষ্ক্রিয়তা শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়িয়ে তুলছে।
 
শ্রমিক নেতারা আরও বলেন, গার্মেন্টস শ্রমিক-কর্মচারীদের সর্বশেষ মজুরি কাঠামো ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নির্ধারণ করা হয়। প্রচলিত শ্রম আইনের ১৩৯(৬) ধারায় নিম্নতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের বিধান রয়েছে। শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কার্যকর করতে হলে যথাসময়ে মজুরি বোর্ড গঠন ও মজুরি পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা প্রয়োজন। নতুন মজুরি কার্যকরের অন্তত ছয় মাস আগে বোর্ড গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তাঁরা বলেন, চলতি বছরের মে মাসের মধ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। অথচ এখনো মজুরি বোর্ড গঠন না হওয়ায় শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি পাওয়ার বিষয়টি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
 
সমাবেশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির উদ্যোগের প্রসঙ্গ তুলে বক্তারা বলেন, একই বাজারে বসবাস ও একই দ্রব্যমূল্যের চাপে থাকা সত্ত্বেও গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি উপেক্ষিত হচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সর্বনিম্ন বেতন প্রায় ৪৮ হাজার ৪০০ টাকা নির্ধারণের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তাঁরা বলেন, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও পরিবারের প্রয়োজন বিবেচনায় না নিয়ে মজুরি নির্ধারণ করা হলে বৈষম্য আরও বাড়বে। দেশের রপ্তানি আয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও শিল্পসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায়িত্ব।
 
বক্তারা বলেন, গার্মেন্টস শিল্পে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, আইনগত সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব দেশীয় কারখানা মালিকদের। তবে বর্তমান বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও বায়ারদেরও দায়িত্ব রয়েছে। উৎপাদন থেকে মুনাফা অর্জনকারী কোনো পক্ষই শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, কর্মপরিবেশ ও অধিকার রক্ষার দায় এড়িয়ে যেতে পারে না। তাই শ্রমিকদের মজুরি ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধ, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং শ্রম অধিকার লঙ্ঘন বন্ধে কারখানা মালিকদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও বায়ারদেরও কার্যকর জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
 
অতীতের শ্রমিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নেতারা বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও দাবি কখনোই সহজে আদায় হয়নি; সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই অধিকার অর্জন করতে হয়েছে। এবারও শ্রমিক-কর্মচারীরা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারলে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন ও ন্যায্য মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে সরকার ও মালিকপক্ষের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে না। তাই সব শ্রমিক সংগঠন, ফেডারেশন ও জোটকে ঐক্যবদ্ধ করে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান তাঁরা।
 
সমাবেশ থেকে শ্রমিক-কর্মচারীদের উদ্দেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, “আর কালবিলম্ব নয়, ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন গড়ে তুলুন। অবিলম্বে মজুরি বোর্ড গঠন, ন্যায্য মজুরি বৃদ্ধি, বকেয়া পাওনা পরিশোধ, ব্ল্যাকলিস্টিং ও দমন-পীড়ন বন্ধ এবং শ্রমিকদের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার ও মালিকপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করুন।”
 
সমাবেশে উত্থাপিত প্রধান দাবিসমূহ:
১. অবিলম্বে গার্মেন্টস শিল্প খাতে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন।
২. ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে বর্ধিত মজুরি কার্যকর করা।
৩. জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যায্য নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ।
৪. শ্রমিকদের সব বকেয়া পাওনা অবিলম্বে পরিশোধ করা।
৫. ব্ল্যাকলিস্টিং, হয়রানি ও দমন-পীড়ন বন্ধ করা।
৬. ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও পরিচালনার পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
৭. শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক ও আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
৮. শ্রম অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় দেশীয় কারখানা মালিকদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও বায়ারদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
 
শ্রমিক নেতারা বলেন, গার্মেন্টস শিল্পের টেকসই উন্নয়ন এবং উৎপাদনব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। তাই শ্রমিকদের দাবিকে উপেক্ষা না করে অবিলম্বে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে; অন্যথায় অধিকার আদায়ে আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে বলে তাঁরা হুঁশিয়ারি দেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...