• আপডেট টাইম : 17/08/2026 05:17 PM
  • 7 বার পঠিত
  • আওয়াজ প্রতিবেদক
  • sramikawaz.com

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) যৌথ উদ্যোগে "বাংলাদেশের শিল্প জরিপ" নিয়ে একটি বিভাগীয় কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কর্মশালায় রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলার সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, শিক্ষক-গবেষক এবং চেম্বার অব কমার্সের প্রতিনিধিসহ অনেকে অংশ নেন। অনুষ্ঠানে জরিপের উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা, সম্ভাবনাময় শিল্প ও বিনিয়োগের খাত চিহ্নিতকরণ, ব্যবসায়ীদের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা এবং তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা কামনা করা হয়।

রোববার (১৬ আগস্ট ২০২৬) রংপুরের আরডিআরএস গেস্ট হাউজে এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।

‘বাংলাদেশের শিল্প জরিপ’ এডিবির অর্থায়নে বিডার একটি উদ্যোগ, যার কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে সানেম। জরিপটির মূল লক্ষ্য বিনিয়োগকারীদের সমস্যা ও সম্ভাবনা চিহ্নিত করা, সেগুলো সমাধানে সহায়তা করা এবং বিনিয়োগ ও নীতি প্রণয়নে সহায়ক একটি হালনাগাদ তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা। এর অংশ হিসেবে দেশের আট বিভাগে ধারাবাহিকভাবে কর্মশালা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যার ধারাবাহিকতায় রংপুরে এই আয়োজন।

কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন রংপুর জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ক্রিস্টোফার হিমেল রিছিল। প্রধান অতিথি ছিলেন বিডার নির্বাহী সদস্য মো. হুমায়ুন কবির। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রংপুর বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মো. আশরাফুল ইসলাম ও রংপুর চেম্বারের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. মনজুর আহমেদ আজাদ। সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. শওকত আলী। অনুষ্ঠানে এডিবির পক্ষে বক্তব্য দেন সংস্থাটির পাবলিক সেক্টর ইকোনমিস্ট তসনিম আলম।

স্বাগত বক্তব্যে সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, জরিপের লক্ষ্য বাংলাদেশের শিল্প ও বিনিয়োগ পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরা। তিনি বলেন, "প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের তথ্য এখন বিডাসহ বিভিন্ন সংস্থা, চেম্বার ও ব্যবসায়ী সংগঠনের কাছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। একটি নির্ভরযোগ্য, সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা গেলে অগ্রাধিকারমূলক খাত চিহ্নিত করা এবং কোথায় বাড়তি নজর দরকার, তা বোঝা সহজ হবে।"

বিডার ওয়ান স্টপ সার্ভিসের (ওএসএস) প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এই জরিপ বিনিয়োগ সহায়তা আরও কার্যকর করার প্রচেষ্টার সঙ্গে জড়িত। ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ওই দেশগুলোতে ওয়ান স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা এক জায়গা থেকেই সিংহভাগ সুবিধা পেয়ে থাকেন।

জরিপের পদ্ধতি তুলে ধরে সানেমের প্রোগ্রাম পরিচালক জুবায়ের হোসেন জানান, জরিপে তিন ধরনের বিনিয়োগকারীকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে—বিদেশি মালিকানাধীন, যৌথ উদ্যোগ ও দেশীয় প্রতিষ্ঠান। বিদেশি ও যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সরাসরি গিয়ে তথ্য নেওয়া হবে, আর দেশীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে হবে নমুনাভিত্তিক জরিপ। প্রতিষ্ঠান, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের তথ্যের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের সমস্যা ও সমাধানের উপায়ও জানার চেষ্টা করা হবে।

জুবায়ের হোসেন আরও বলেন, বিডা, বেজা, বেপজা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে সানেমের করা প্রাথমিক ম্যাপিংয়ে দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানের ভৌগোলিক অবস্থানে বড় ধরনের অসমতা দেখা গেছে। সবচেয়ে বেশি শিল্প প্রতিষ্ঠান ঢাকায়, এরপর চট্টগ্রামে। সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রাথমিক ম্যাপিংয়ে রংপুরে মাত্র সামান্য কিছু প্রতিষ্ঠান স্থান পেয়েছে।

তিনি জানান, জরিপ শেষে এর ফল ও কর্মশালাগুলোর সুপারিশ প্রতিবেদন আকারে বিডাকে দেওয়া হবে। তবে পুরো বিনিয়োগকারী তথ্যভাণ্ডার সবার জন্য উন্মুক্ত না-ও থাকতে পারে; এটি মূলত নীতি প্রণয়নে ব্যবহৃত হবে। এই উদ্যোগের আওতায় একটি "বিনিয়োগ কম্পেন্ডিয়াম" তৈরি হবে, যাতে একটি সাধারণ অংশ ও খাতভিত্তিক অংশ থাকবে।

এডিবি বাংলাদেশের পাবলিক সেক্টর ইকোনমিস্ট তসনিম আলম বলেন, বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ এই জরিপের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। হাতে তিন বছরের মতো সময় আছে, এই সময়ের মধ্যে সঠিক চাহিদা নিরূপণ করা জরুরি। তিনি বলেন, বেসরকারি খাত মূলত নিজেদের চেষ্টাতেই টিকে আছে, তবে এখন ব্যবসা সহজীকরণের পরিবেশ নিশ্চিত করার সময় এসেছে।

রংপুর প্রসঙ্গে তসনিম আলম বলেন, কৃষিনির্ভর এই বিভাগে অনেক সম্ভাবনা এখনো অব্যবহৃত। গ্যাস ও জ্বালানি–সংকটে ভারী শিল্প গড়ে তোলা কঠিন হওয়ায় তিনি বিকল্প বা প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন। এলডিসি–পরবর্তী সময়ে কী ধরনের সহায়তা লাগবে, তা নির্ধারণে সঠিক তথ্য দেওয়ার জন্য কর্মশালার অংশীজনদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (আরসিসিআই) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মনজুর আহমেদ আজাদ উদ্যোগটিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, রংপুরের শিল্প সম্ভাবনা জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরা দরকার। এ জন্য আরসিসিআই সব ধরনের সহযোগিতা করবে।

রংপুর বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, দেশজুড়ে শিল্পের সমস্যা, সুযোগ ও বিনিয়োগ সম্ভাবনার একটি হালনাগাদ তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা জরুরি। সঠিক তথ্য পেলে সরকার কার্যকর নীতি প্রণয়ন করতে পারবে। উত্তরাঞ্চলের অংশীজনদের প্রতি তাঁর আহ্বান, নিজেদের এলাকার বাস্তবতা মাথায় রেখে বিকল্প বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজে বের করা।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. শওকত আলী আঞ্চলিক বৈষম্যের প্রসঙ্গ তুলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পের মধ্যে মেলবন্ধন বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি রংপুরের সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে কৃষি ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ, বিশেষ করে আলু ও ভুট্টার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত হিমাগার না থাকায় বাম্পার ফলন হলেও আলুর কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যায় না এবং প্রচুর আলু নষ্ট হয়। এ ছাড়া ভুট্টা থেকে পপকর্নের মতো প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরির ভালো সুযোগ রয়েছে।

বিনিয়োগকারী ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা দরকার উল্লেখ করে বিডার নির্বাহী সদস্য মো. হুমায়ুন কবির "ইনভেস্ট বাংলাদেশ" উদ্যোগের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, এর মাধ্যমে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সব সেবা একই প্ল্যাটফর্মে আনা হচ্ছে। "বাংলাদেশের শিল্প জরিপ" শুধু শ্রেণিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি আঞ্চলিক বিনিয়োগ পরিস্থিতিও তুলে ধরবে। কেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্ত গ্রহণে আঞ্চলিক বাস্তবতা প্রায়ই উপেক্ষিত হয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

কর্মশালার সভাপতি ক্রিস্টোফার হিমেল রিছিল বলেন, শতরঞ্জি ও হাড়িভাঙ্গা আম রংপুরের জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) পণ্য। শতরঞ্জি বর্তমানে প্রায় ৫০টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। দুগ্ধ ও তামাক শিল্পকেও সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করে তিনি রংপুরের আরএফএল ও শ্যামপুর চিনিকলের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।

মুক্ত আলোচনায় রংপুর ও আশপাশের জেলাগুলোর বিনিয়োগ সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়। এতে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ, নারী উদ্যোক্তা, ঐতিহ্যবাহী শিল্প, অর্থায়ন, অবকাঠামো, জ্বালানি, পরিবহন ও রপ্তানি বহুমুখীকরণের বিষয়গুলো প্রাধান্য পায়। বক্তারা উল্লেখ করেন, এই অঞ্চলের কৃষিই শিল্পের সবচেয়ে বড় অব্যবহৃত সম্ভাবনা। দিনাজপুরের লিচু ও কাটারিভোগ চাল, রংপুরের হাড়িভাঙ্গা আম, আলু, ভুট্টা, তামাক ও ড্রাগন ফলের মতো ফসলে মূল্য সংযোজন (Value Addition) ও রপ্তানি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। পার্বতীপুরে বেবি কর্ন প্রক্রিয়াকরণ এবং গাইবান্ধায় আনারস প্রক্রিয়াকরণ ও রাইস ব্র্যান তেল উৎপাদনকে সফল উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

আলোচনায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকারের সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও উঠে আসে। বিশেষ করে আলু রপ্তানিতে ভারতীয় বাজারে প্রবেশাধিকার সহজ করার দাবি জানান অংশগ্রহণকারীরা। পাশাপাশি পাটজাত পণ্যকে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার, প্রক্রিয়াজাত লিচু ও পাঁপড় বিদেশে রপ্তানির প্রস্তাব দেওয়া হয়, যা নারীদের ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া শতরঞ্জি, বেনারসি, কাঠের পুতুল ও মণিপুরী শাড়ির মতো ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিলে নারী উদ্যোক্তাদের পরিধি আরও বাড়বে বলে মতামত দেওয়া হয়।

নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়ানোর দাবি ওঠে। তবে ঐতিহ্যবাহী বেনারসি পল্লী ও নিশবেতগঞ্জের শতরঞ্জি শিল্পের বর্তমান নাজুক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বক্তারা। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উচ্চ সুদের হার এবং অপ্রতুল বিদ্যুৎ সরবরাহকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করে সুদের হার কমানো, লজিস্টিক সুবিধা বৃদ্ধি ও একটি কনটেইনার ডিপো স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা প্রসঙ্গে রংপুর, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ের একাধিক চিনিকল এবং বস্ত্রকল চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি বাজেট বরাদ্দে চট্টগ্রাম বা ঢাকার তুলনায় উত্তরাঞ্চলের আঞ্চলিক বৈষম্যের বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। বিসিকের এক প্রতিনিধি “এক গ্রাম, এক পণ্য” উদ্যোগের কথা তুলে ধরে জানান, পীরগঞ্জে মানুষের চুল দিয়ে প্রস্তুতকৃত কৃত্রিম চুল/পণ্য বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারেও রপ্তানি হচ্ছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...