• আপডেট টাইম : 22/07/2026 12:24 AM
  • 1713 বার পঠিত
  • মো. হাসান আলী
  • sramikawaz.com

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প শুধু একটি রপ্তানিমুখী খাত নয়; এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং শিল্পায়নের ইতিহাসে এই খাতের অবদান অনস্বীকার্য। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে লাখো শ্রমিকের শ্রম, দক্ষতা ও ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে।
তবে এই সাফল্যের আড়ালে একটি মৌলিক প্রশ্ন বারবার সামনে আসে যে শ্রমিকদের পরিশ্রমে শিল্পটি টিকে আছে, তাদের ন্যায্য মজুরি কি সময়মতো এবং আইন অনুযায়ী পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে?


বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৩৯(৬) ধারা অনুযায়ী, কোনো শিল্পে নিযুক্ত শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরির হার প্রতি তিন বছর অন্তর পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। এটি কোনো প্রশাসনিক সৌজন্য নয়; এটি একটি বাধ্যতামূলক আইনি দায়িত্ব। এই বিধানের পেছনে যুক্তিও স্পষ্ট। অর্থনীতির বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়, মূল্যস্ফীতি বাড়ে, খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। ফলে নির্দিষ্ট সময় পর মজুরি পুনর্বিবেচনা না করলে শ্রমিকের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত কমে যায়।


এই আইনের আলোকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ২০২৩ সালের ৯ এপ্রিল তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে। দীর্ঘ আলোচনা, শুনানি ও মতবিনিময়ের পর ২০২৩ সালের নভেম্বরে সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয় এবং ১৮ ডিসেম্বর গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে তা কার্যকর হয়।


কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। ২০২৩ সালের ৯ এপ্রিল গঠিত মজুরি বোর্ডের কার্যকাল ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল শেষ হয়েছে। একইভাবে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর কার্যকর হওয়া মজুরি কাঠামোর তিন বছরও চলতি বছরের ডিসেম্বরেই পূর্ণ হবে। অর্থাৎ আইন অনুযায়ী নতুন মজুরি নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় তদন্ত, শুনানি, সুপারিশ এবং গেজেট প্রকাশের কাজ সময়মতো শেষ করতে হলে ২০২৬ সালের এপ্রিলের পরপরই নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করা প্রয়োজন ছিল।


কিন্তু বাস্তবে এখনো সে ধরনের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।এটি শুধু একটি প্রশাসনিক বিলম্ব নয়; এটি আইনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন তৈরি করে। কারণ আইন যদি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়, তাহলে সেই সময়সীমা অনুসরণ করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব।


মজুরি পুনর্নির্ধারণের ইতিহাস কী বলে?
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে নিম্নতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের ইতিহাসই প্রমাণ করে যে নির্দিষ্ট সময় পরপর মজুরি পুনর্বিবেচনা একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি। ১৯৮৫ সালে প্রথমবারের মতো এই খাতে সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি নির্ধারণ করা হয় ৬২৭ টাকা। এরপর ১৯৯৪ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৯৩০ টাকা। ১৯৯৭ সালে সর্বনিম্ন মজুরি ১,৫৫০ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হলেও তা কার্যকর হয়নি। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ করা হয় ১,৬৬২.৫০ টাকা, ২০১০ সালে ৩,০০০ টাকা, ২০১৩ সালে ৫,৩০০ টাকা, ২০১৮ সালে ৮,০০০ টাকা এবং সর্বশেষ ২০২৩ সালে ১২,৫০০ টাকা। এই ধারাবাহিকতা স্পষ্টভাবে দেখায় যে শ্রমিকদের মজুরি অর্থনৈতিক বাস্তবতা, মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যায়ক্রমে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।


বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৩৯(৬) ধারা অনুযায়ী, কোনো শিল্পে নিযুক্ত শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরির হার প্রতি তিন বছর অন্তর পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। সেই আলোকে ২০২৩ সালের ৯ এপ্রিল নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করা হয় এবং ওই বছরের ১৮ ডিসেম্বর গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর হয়। ২০২৩ সালে মজুরি পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়ার পর তিন বছরের সময়কাল ২০২৬ সালের এপ্রিলে অতিক্রম করেছে। অন্যদিকে বর্তমান মজুরি কাঠামোর তিন বছর পূর্ণ হবে ২০২৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর। ফলে আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হলে তদন্ত, শুনানি, মতামত গ্রহণ, সুপারিশ প্রণয়ন এবং গেজেট প্রকাশের জন্য নতুন নিম্নতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের কার্যক্রম ইতোমধ্যেই শুরু হওয়া উচিত ছিল।


নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি কোনো নতুন বা অতিরিক্ত দাবি নয়; এটি বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী একটি স্বাভাবিক, নিয়মিত এবং বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া। সময়মতো এই প্রক্রিয়া শুরু না হলে শুধু আইনের ব্যত্যয়ই ঘটে না, বরং শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার, শিল্পের স্থিতিশীলতা এবং দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মুখে পড়ে।


বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা এই প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করেছে:

গত কয়েক বছরে খাদ্যপণ্য, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, যাতায়াত, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে ১২ হাজার ৫০০ টাকার সর্বনিম্ন মজুরি দিয়ে একটি শ্রমিক পরিবারের ন্যূনতম জীবনধারণ ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক শ্রমিক মাসের প্রথম দিকেই বেতনের বড় অংশ ব্যয় করে ফেলেন। এরপর ধার-দেনা, ঋণ কিংবা অতিরিক্ত ওভারটাইমের ওপর নির্ভর করে বাকি মাস পার করতে হয়।


এর প্রভাব শুধু শ্রমিকের ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না। অপুষ্টি, স্বাস্থ্যঝুঁকি, মানসিক চাপ এবং আর্থিক অনিশ্চয়তা শেষ পর্যন্ত উৎপাদনশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একজন অসুস্থ, অপুষ্ট ও উদ্বিগ্ন শ্রমিকের কাছ থেকে আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।


অনেকে মনে করেন, শ্রমিকের মজুরি বাড়লে শিল্পের প্রতিযোগিতা কমে যাবে। বাস্তবতা কিন্তু আরও জটিল। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এখন আর শুধু কম মজুরির ওপর নির্ভর করে না। ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই শ্রমিকের অধিকার, ন্যায্য মজুরি, মানবাধিকার, পরিবেশগত দায়বদ্ধতা এবং দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের করপোরেট সাসটেইনেবিলিটি ডিউ ডিলিজেন্স (CSDDD) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক নীতিমালার প্রেক্ষাপটে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কযুক্ত।অর্থাৎ ন্যায্য মজুরি এখন শুধু সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং বাজার ধরে রাখারও একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।


অন্যদিকে সময়মতো মজুরি পুনর্নির্ধারণ না হলে প্রতি তিন বছর পরপর একই ধরনের অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে শ্রমিক, মালিক, সরকার কেউই লাভবান হয় না। উৎপাদন ব্যাহত হয়, রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মুখে পড়ে।


এই বাস্তবতায় মজুরি নির্ধারণকে আন্দোলননির্ভর নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক ও পূর্বনির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসতে হবে। আইন যেহেতু তিন বছর অন্তর মজুরি পুনর্বিবেচনার বাধ্যবাধকতা দিয়েছে, তাই সেই সময়সীমা মেনেই নতুন মজুরি বোর্ড গঠন, গবেষণাভিত্তিক ব্যয় বিশ্লেষণ, শ্রমিক-মালিক-সরকারের অংশগ্রহণমূলক আলোচনা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই গেজেট প্রকাশ নিশ্চিত করা জরুরি।
নতুন মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করলেই চলবে না। একটি শ্রমিক পরিবারের খাদ্য, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, যাতায়াত, সামাজিক নিরাপত্তা, পুষ্টি, সঞ্চয় এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের ন্যূনতম ব্যয়কে বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে শিল্পের উৎপাদনশীলতা, রপ্তানি সক্ষমতা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানার বাস্তবতাও বিবেচনা করা প্রয়োজন। অর্থাৎ লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি ভারসাম্যপূর্ণ, বাস্তবসম্মত এবং টেকসই মজুরি কাঠামো।


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শ্রম আইনকে কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। আইন যদি সময়মতো বাস্তবায়িত না হয়, তবে তার প্রতি আস্থা দুর্বল হয়। তাই নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনকে কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক বা আন্দোলনের ফলাফল হিসেবে নয়, বরং আইনের স্বাভাবিক ও বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া হিসেবেই দেখা উচিত।


শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতি তাই জোরালো আহ্বান অবিলম্বে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় মজুরি পুনর্নির্ধারণের কার্যক্রম শুরু করুন। কারণ সময়মতো ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা শুধু শ্রমিকের অধিকার রক্ষা করবে না; এটি শিল্পে স্থিতিশীলতা আনবে, উৎপাদনশীলতা বাড়াবে, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা আরও সুদৃঢ় করবে এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে আরও টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।


মো: হাসান আলী : সাংগঠনিক সম্পাদক,  বাংলাদেশ ন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...